ই-কমার্স ব্যবসায় সফল হওয়ার কিছু পরামর্শ
অনলাইনে ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন? পূঁজি ও লোকবলের ঘাটতি নিয়েও সাহস করেছেন ই-কমার্স ভিত্তিক কোন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করার? তাহলে এই দশটি ই-কমার্স টিপস আপনার জন্যই। এই পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে আমরা SEO (Search Engine Optimization) থেকে শুরু করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জানব। আপনার স্বল্প পরিসরের ই-কমার্স ব্যবসায়ে সাফল্য অর্জনে সাহায্য করবে এই পরামর্শগুলো।
ইন্টারনেটের প্রসারের কারনে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ক্রেতা ও গ্রাহকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে ই-কমার্স ব্যবসা। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবসা-জগতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ই-কমার্স সেক্টরের বিকল্প নেই। হাতে হাতে সবার মোবাইল ফোন এবং ছোট-বড় সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু শুধুমাত্র একটি সার্চের দূরত্বে অবস্থান করছে। গুগলে সার্চ করুন। ফেসবুক পেইজ কিংবা ওয়েবসাইট থেকে অর্ডার করুন। বাসায় বসে আপনার পন্যটি হাতে পেয়ে যান। অনলাইন বাজারে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা বা উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখার জন্য শুধুমাত্র ই-কমার্সের গতানুগতিক কৌশলের প্রয়োগ যথেষ্ট না। বরং, সব পরিকল্পনা ও কর্মকৌশলের সম্মিলিত ও সঠিক বাস্তবায়নও জরুরি।
যেকোন ব্যবসায়ের ক্ষেত্রেই রাতারাতি সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। তবে সঠিক জ্ঞান ও পর্যাপ্ত পরিকল্পনার বিষয়ে জানাশোনা কম থাকার কারণে অনেক ক্ষুদ্র ই-কমার্স ব্যবসা দীর্ঘ সময়েও কাঙিক্ষত সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয় না। ব্যবসা এখন আর স্থান বা ভৌগোলিক সীমানাতে সীমাবদ্ধ নেই। বিক্রেতার সৃজনশীলতা এবং নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করার দক্ষতার মাধ্যমে পন্য এখন সহজেই ক্রেতার দরজায় হাজির করা সম্ভব। আপনার অনলাইন ব্যবসাকে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে, এখানে আমরা এমন কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি ।
কাস্টোমারদের আস্থা অর্জন
যেকোন ব্যবসার জন্য ক্রেতাদের আস্থা অর্জন অত্যন্ত জরুরী। অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে একজন বিক্রেতার হাতে, ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার সময় খুব কম থাাকে৷ তাই এই সময়টাকেই এমন ভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে ক্রেতা পণ্যটির প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং এখান থেকেই পণ্যটি কিনতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে৷ ওয়েবসাইটের উপযুক্ত বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা, ক্রেতার কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে সহজ ও সাবলীল করে তুলে। যেকোন ই-কমার্স উদ্যোগের ক্ষেত্রে একটি সুন্দর ও আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট খুবই জরুরী। এর ফলে, ক্রেতাদের মনে সেই উদ্যোগটি সম্পর্কে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরী হয়। তবে মনে রাখতে হবে, ওয়েবসাইটের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়েও এর সহজ কাঠামো ব্যবহারকারীদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। কাস্টোমার সবসময়ই ঝামেলাহীন ও সহজ কোন পদ্ধতিতে বেশি পছন্দ করে।
কাস্টোমার নির্ভর ব্যবস্থাপনা
ক্রেতাদের পূর্বের ভাল অভিজ্ঞতা এক ধরনের পরোক্ষ বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করে। অনলাইন ব্যবসার অন্যতম একটি বাঁধা হল, একজন কাস্টোমার পণ্যগুলোকে সরাসরি দেখতে, ছুঁতে, অনুভব করতে কিংবা প্রয়োজন সাপেক্ষে এর ঘ্রাণ নিতে পারেন না। যার ফলে কাস্টোমার একধরণের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। একজন বিক্রেতাকে নিশ্চিত করতে হবে যে, একজন ক্রেতা যেনো কোনো ধরনের দ্বিধাদ্বন্ধ ছাড়া পণ্যটি কিনতে পারে। এক্ষেত্রে ওয়েবসাইটের সহজ কাঠামো, পণ্যের ন্যায্য মূল্য, স্বল্প মূল্যে বা ফ্রী ডেলিভারি এবং যেকোনো ধরনের অসংগতির জন্য পণ্যের পরিবর্তন বা মূল্য ফেরত ব্যবস্থা, ইত্যাদি সুবিধা রাখতে হবে। যাতে ক্রেতারা পণ্যটি ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা বোধ করে।
মোবাইলভিত্তিক ওয়েবসাইট কাঠামো
এন্ড্রয়েড মোবাইলের সহজলভ্যতার কারনে আজ সকলের হাতে হাতে স্মার্টফোন। ব্যবসার ওয়েবসাইট তৈরির ক্ষেত্রে যদি মোবাইল ব্যবহারকারীদের মাথায় না রাখা হয়, তাহলে ব্যবসাটি তার নির্ধারিত ক্রেতার একটি বড় অংশের কাছে পৌছাতে পারবে না। এর ফলাফল হবে স্বল্প মুনাফা। তাই একজন ব্যবসায়ীকে নিজ ব্যবসায়ের প্রসারের কথা মাথায় রেখে মোবাইল রেসপনসিভ ওয়েবসাইট তৈরী করতে হবে। ২০২০ সালে ওয়েবসাইট ভিজিটরের হারের দিকে মোবাইল ব্যবহারকারীরা এগিয়ে আছে। ৫০% এর বেশি মানুষ মোবাইল থেকেই ওয়েবসাইট ভিজিট করেন।
সামাজিক মাধ্যমের সঠিক ব্যবহার
যেকোনো অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম বা স্যোশ্যাল মিডিয়াকে সঠিক গুরুত্ব দিতে হয়। যদি কোন ই-কমার্স উদ্যোগের ক্ষেত্রে স্যোশ্যাল মিডিয়াকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করা যায়, তাহলে নির্ধারিত মুনাফা অর্জন করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমান যুগে সামাজিক মাধ্যমগুলো অনলাইন ব্যবসায়গুলোর অন্যতম প্রধান প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। আপনার অনলাইন ব্যবসার জন্য সামাজিক মাধ্যমগুলো হতে পারে সর্বোবৃহৎ বিজ্ঞাপন মাধ্যম। ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রামের মত স্যোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, আপনার ব্যবসাকে পৌঁছে দিবে ক্রেতাদের নিউজফিডে। পণ্য এবং ক্রেতার দূরত্ব হবে মাত্র একটি ক্লিকের। ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে খুব সহজেই আপনার ক্রেতারা পণ্যের যেকোনো ধরনের জিজ্ঞাসা নিয়ে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। এর মাধ্যমে ক্রেতাদের আস্থা যেমন বৃদ্ধি পাবে। তেমনি দ্বিধাদ্বন্ধ কাটিয়ে তারা তাদের পছন্দের পণ্যটি ক্রয় করতে পারবে।
পণ্যের আকর্ষণীয় উপস্থাপন
অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে ও স্যোশ্যাল মিডিয়ায় পণ্যটির সুন্দর উপস্থানের কোন বিকল্প নেই। বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে এর আকর্ষণীয় ছবিই হবে এর ক্রেতা আকৃষ্ট করার পন্থা। যেকোনো পণ্যের ক্ষেত্রেই একজন নতুন ক্রেতা পণ্যের প্রতি তখনই আকৃষ্ট হবে যখন সেই পণ্যের ছবিটি সুন্দর হবে। একজন ক্রেতা অবশ্যই জানতে চাইবেন আসল পণ্যটি দেখতে হুবহু একই কিনা। এক্ষেত্রে আসল পণ্যের একটি সুন্দর ছবির মাধ্যমেই একজন ক্রেতা পণ্যটি কেনার জন্য যোগাযোগ করবে বা পরবর্তী ধাপে যাবে। প্রয়োজনে ক্রেতাকে পণ্যের আরও ছবি দেখানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। সম্ভব হলে পন্যের ভিডিও, রিভিউ রাখা যেতে পারে।
ই-কমার্স উদ্যোগে এসইও এর গুরুত্ব অসীম
যেকোনো ছোট ব্যবসায়ে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে এসইও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এসইও বা Search Engine Optimization হল অসংখ্য ওয়েবসাইটের ভেতর আপনার ওয়েবসাইটটিকে সার্চ ইন্জিনের রেজাল্টে প্রথম পাতায় নিয়ে আসা। এসইও এর ব্যবহার ছাড়া ওয়েবসাইট তৈরি করা আর ঠিকানাবিহীন বাড়ি খোঁজা একই কথা। প্রযুক্তির প্রসারের কারনে দিন দিন অনলাইন ব্যবসায়ের পরিমান যেমন বাড়তে থাকবে, তারসাথে পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন ওয়েবসাইটও তৈরি হবে। এই প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে এসইও এর গুরুত্ব এবং ব্যবহার সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ের শুরুতেই একজন এসইও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও সাহায্য নিলে তা আপনার ব্যবসাকে দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করবে। এর জন্য বিপুল পরিমান মূলধনের প্রয়োজন নেই। এসইও এর সঠিক ব্যবহার, কাস্টোমারকে আপনার ওয়েবসাইট পর্যন্ত নিয়ে আসার রাস্তাটা সহজ করে দিবে।
কাস্টোমারদের প্রতিক্রিয়া ও মতামত সম্পর্কে মনোযোগী থাকা
পণ্য বিক্রির মাধ্যমে ক্রেতার সাথে বিক্রেতার সম্পর্ক শেষ হয় না বরং শুরু হয়। যে কোনো ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ক্রেতার সন্তুষ্টিই হচ্ছে মুখ্য। আপনার ওয়েবসাইট থেকে একজন কাস্টোমারের প্রথম কেনাকাটা অভিজ্ঞতা ভালো হলেই পরবর্তীতে আবার আপনার ওয়েবসাইটে তিনি আসবেন। পণ্য বিক্রয়ের পর পণ্য সম্পর্কে ক্রেতার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কেমন হচ্ছে, সেই বিষয়ে একজন বিক্রেতাকে খুব ভালোভাবে ধারণা রাখতে হবে। ক্রেতাদের যেন এমনটা মনে না হয় যে তারা একটা যন্ত্রের সাথে কথা বলছেন। এই প্রতিকূলতা কাটাতে বিক্রেতা লাইভ চ্যাট বা ভিডিওয়ের মাধ্যমে ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। এতে করে ক্রেতারা তাদের অভিযোগ বা পরামর্শ বিক্রেতাকে জানাতে পারবেন। ক্রেতাদেরও একটি দোকানে কেনাকাটা করার মত অনুভূতি হবে। এই ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া গ্রহণ ব্যবসায়ের ব্র্যান্ড সম্পর্কে ক্রেতাদের মাঝে বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততা বৃদ্ধি করে।
ক্রেতাদের তথ্যের নিরাপত্তা
অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রেতার কোনো ধরনের ফিজিক্যাল ইনভলবমেন্ট বা শারীরিক অংশগ্রহন থাকে না। এর ফলে কাস্টোমারের মনে অনিরাপত্তার বোধ থাকতে পারে। তাই ক্রেতাকে ভার্চুয়ালভাবে নিরাপদ বোধ করানো বিক্রেতার কর্তব্য। ক্রেতার সকল ধরনের তথ্যের নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে যা ক্রেতাকে সকল ধরনের প্রতারণা থেকে মুক্ত রাখবে। এই ব্যপারটি অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যপার। অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে থাকলে সেটার নিরাপত্তা যেনো শতভাগ সঠিক হয়, তথ্যচুরির সুযোগ যাতে না থাকে, এই বিষয়গুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সঠিক টুলসের ব্যবহার
ছোট বা নতুন ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন নতুন ব্যবসায়িক অ্যাপ বা টুলসের ব্যবহার আপনার উদ্যোগটিকে অন্যদের চেয়ে আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে সাহায্য করতে পারে। পাকাপোক্ত ভাবে ব্যবসায়টিকে শুরু করার আগে কিছু নতুন টুলসের সাথে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। যেমন, ক্রেতাদের সমস্ত তথ্য এ্যাক্সেল শিটে এন্ট্রি করে রেখে গ্রাফ আকারে সাজিয়ে নিন। তারপর, নানা পদ্ধতিতে তথ্যগুলোকে পর্যালোচনা করার মাধ্যমে সহজেই বের করে নিতে পারেন আপনার ই-কমার্স উদ্যোগটির গ্রোথ বা সার্বিক অবস্থা। আবার, কোন ইমেইল ম্যানেজমেন্ট টুলসের মাধ্যমে ই-মেইল ক্যাম্পেইন কীভাবে করা যায়, সেটাও শিখে নিতে পারেন।
তবে, যেকোন ধরণের টুল ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই নিজের ব্যবসায়ের ধরন সম্পর্কে সঠিকভাবে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। নিজ ব্যবসায় সম্পর্কে সঠিক ধারনা অর্জনের মাধ্যমে আপনি সঠিক টুলটি বাছাই করে নিতে পারবেন। সঠিক তথ্য ও গবেষণাই আপনার ব্যবসায়টিকে টিকিয়ে রাখবে। তাই অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন টুলস এবং মেট্রিক্স সম্পর্কে ধারনা রাখতে হবে যা আপনাকে ব্যবসায়ের পরিসংখ্যান, মুনাফা, ধারণক্ষমতা, লক্ষ্যবস্তু ইত্যাদি বিষয়ে সাহায্য করবে।
নতুন একটি ব্যবসা শুরু করা, কোনো অংশে একটি সংগ্রামের চেয়ে কম নয়। আপনার এই স্বপ্নের সংগ্রামটিকে একটু খানি সহজ করার জন্যই আমাদের উদ্দেশ্য। ই-কমার্স ওয়েবসাইট কিংবা যেকোন ধরণের অনলাইন উদ্যোগে প্রয়োজন হলে আপনি আমাদের জানাতে পারেন। কোডসপাজল আপনার পাশেই আছে। একটি বিষয় মনে রাখবেন, যেকোন ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে একাগ্রতা। সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করা এবং সঠিক কৌশল অবলম্বন করা। পরিশেষে, এটাই বলা যায় যে, ব্যবসাকে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। সামাজিক ট্রেন্ড, প্রযুক্তি, ক্রেতাদের পছন্দ-অপছন্দ সময়ের সাথে বদলাতে থাকবে। ব্যবসাকেও সেই অনুসারে তার ধরন বদলাতে হবে। যাতে করে আপনার ব্যবসাটি সুন্দর ভাবে বেড়ে উঠতে পারে এবং সাফল্য অর্জন করে সবার মাঝে সেরা হয়ে উঠতে পারে।